ঢালী আরিফ, ভোটের মাঠ থেকে—
বাংলাদেশের প্রতিটি নির্বাচনের আগে একটি প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে—ভোট দিলে কি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবে? এই প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় দ্বিধা-দ্বন্দ্ব। একপক্ষ মনে করে, ইসলামী দলকে ভোট না দিলে ইসলামকে ঠকানো হয়; অন্যপক্ষ আবার মনে করে, ভোটের রাজনীতির সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্কই নেই। এই দুই চরম অবস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়—সে বুঝতে পারে না, আল্লাহ আসলে তার কাছ থেকে কী চান।
প্রথমেই একটি মৌলিক সত্য পরিষ্কার করা জরুরি। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ দীন—এটি কুরআনের ঘোষিত সত্য। কিন্তু “পূর্ণ” হওয়া আর “প্রতিষ্ঠিত” হওয়া এক বিষয় নয়। ইসলাম পূর্ণ মানে এর বিধান সম্পূর্ণ; আর প্রতিষ্ঠা মানে সেই বিধান মানুষের জীবন, সমাজ ও ক্ষমতার আচরণে বাস্তব রূপ নেওয়া। এই বাস্তবায়ন কখনোই কেবল ব্যালট বাক্স থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেরিয়ে আসে না। ভোট একটি উপায় হতে পারে, কিন্তু কখনোই উদ্দেশ্য নয়।
এখানেই সবচেয়ে বড় ইল্যুশন তৈরি হয়। আমরা ভাবতে শুরু করি—একটি দলকে ভোট দিলেই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। ইতিহাস ও বাস্তবতা বলে, তা হয় না। ইসলামী রাষ্ট্র তখনই কায়েম হয়েছিল, যখন সমাজ ন্যায়কে চেয়েছিল, জুলুমকে ঘৃণা করেছিল এবং নেতৃত্বকে জবাবদিহির মধ্যে রেখেছিল। রাষ্ট্র এসেছে সেই নৈতিক বাস্তবতার ফল হিসেবে—কোনো কৌশলী ঘোষণা বা রাজনৈতিক স্লোগানের মাধ্যমে নয়।
ভাবুন, আপনি জনগণের জন্য একটি ঘর বানাতে চান। আপনার কাছে ইট আছে—যা আইন; সিমেন্ট আছে—যা রাষ্ট্রব্যবস্থা; আর নিখুঁত নকশাও আছে—যা ইসলাম। কিন্তু যদি রাজমিস্ত্রি সৎ না হয়, নেতা নিজেই চুরি করে, আর কাজে ফাঁকি চলতে থাকে—তাহলে কি সেই ঘর দাঁড়াবে? নিশ্চয়ই না। নকশা যত নিখুঁতই হোক, সততা ও দায়িত্ববোধ না থাকলে ঘর ভেঙে পড়বেই। ইসলামী রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ঠিক এমনই। ইসলামের নকশা আগে থেকেই সম্পূর্ণ ও পরিপূর্ণ, কিন্তু ন্যায় ও আমানতদারিতা না থাকলে সেই নকশা রাষ্ট্রের রূপ নিতে পারে না।
ভোটকে ইসলামী দৃষ্টিতে বুঝতে হলে একটি নীতির ওপর দাঁড়াতে হয়—কম ক্ষতির নীতি। যখন নিখুঁত ভালো বিকল্প নেই, তখন বড় ক্ষতি ঠেকানোই দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় আজ নিখুঁত ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মতো কোনো দল নেই; আবার রাজনীতির বাইরে থাকলেও জুলুম আপনাআপনি থেমে যায় না। এই পরিস্থিতিতে ভোট দেওয়া বা না দেওয়া—দুটোই নৈতিক সিদ্ধান্ত, তবে শর্তসাপেক্ষ।
এছাড়া ভোটের মাঠে “কুরআন দিয়ে রাষ্ট্র চালানো” কথাটিও এক ধরনের ইল্যুশন হয়ে দাঁড়িয়েছে, যখন এটিকে স্লোগান বানিয়ে বাস্তবতার দায় এড়িয়ে যাওয়া হয়। কুরআন কোনো নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো বা প্রশাসনিক নোটবুক নয়; এটি ন্যায়, ইনসাফ ও জবাবদিহির মানদণ্ড। কিন্তু ভোটের সময় এই কথাটি এমনভাবে ব্যবহার করা হয় যেন ক্ষমতায় গেলেই কুরআন আপনা-আপনি রাষ্ট্র চালাতে শুরু করবে। বাস্তবে যদি শাসক জবাবদিহির বাইরে থাকে, দুর্নীতি ও জুলুম চলতে থাকে, আর ভিন্নমত দমন করা হয়—তাহলে কুরআনের নাম উচ্চারিত হলেও রাষ্ট্র কুরআনের পথে চলে না। তাই ভোটের মাঠে কুরআনের কথা তখনই অর্থবহ, যখন তা স্লোগান নয়, শাসনের আচরণে ন্যায়ের প্রতিশ্রুতি হয়ে ওঠে; নচেৎ এটি মানুষের ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে তৈরি করা আরেকটি ন্যারেটিভ মাত্র।
ভোট তখনই অর্থবহ হয়, যখন মানুষ প্রশ্ন করে—কে সবচেয়ে কম জুলুম করবে, কে সবচেয়ে বেশি জবাবদিহি মানবে, কে ক্ষমতার নামে ইসলামকে ঢাল বানাবে না। এখানে দলের নাম, স্লোগান বা ধর্মীয় পরিচয় মুখ্য নয়; মুখ্য হলো ফলাফল। যে পক্ষ ক্ষমতায় গেলে অন্যায় কমবে, মানুষের সম্মান ও অধিকার তুলনামূলকভাবে নিরাপদ থাকবে—তাকে সমর্থন করা ইসলামবিরোধী নয়। আবার উন্নয়নের নামে যদি জুলুম, দমন ও অন্যায় বৈধ করা হয়, তবে সেই উন্নয়ন ইসলামের মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য থাকে না।
আরেকটি বড় বিভ্রান্তি হলো—ভোট না দিলে যেন ঈমান রক্ষা পায়। বাস্তবে যদি ভোট না দেওয়া মানে সবচেয়ে ক্ষতিকর শক্তিকে নির্বিঘ্নে জায়গা করে দেওয়া হয়, তবে সেই নীরবতা আর নিরপেক্ষ থাকে না; তা অন্যায়কে সহজ করে। ইসলাম মানুষকে অন্যায়ের শরিক হতে নিষেধ করে—কর্মে হোক বা নীরবতায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ইসলামী রাষ্ট্র আল্লাহর কাছে কোনো স্লোগান নয়; এটি ন্যায়ের একটি রূপমাত্র। আল্লাহ দেখেন না আপনি কাকে ভোট দিয়েছেন, তিনি দেখেন আপনি জালেমের পাশে দাঁড়িয়েছেন, না মজলুমের। সমাজ যদি এই জায়গায় পৌঁছায় যে, “আমার লোক হলেও অন্যায় করলে সমর্থন করব না”, যদি ক্ষমতার প্রশ্নে নৈতিকতা বড় হয়ে ওঠে—তাহলেই ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরি হয়। তখন রাষ্ট্র কাগজে নয়, বাস্তবে বদলাতে শুরু করে।
ইসলামে নেতৃত্বের যোগ্যতা কোনো দলের নাম বা আলেম পরিচয়ে নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় আমানতদারিতা, ন্যায়পরায়ণতা ও সক্ষমতার মাধ্যমে। ইসলামী দলের নাম থাকলেই বা একজন আলেম নেতা হলেই ইসলাম কায়েম হয়ে যায়—এমন কোনো শরিয়তসম্মত নিশ্চয়তা নেই। কারণ ইসলাম কায়েম হয় স্লোগানে নয়, শাসকের আচরণে; পরিচয়ে নয়, জবাবদিহি ও যোগ্যতায়। যে নেতা নিজের লোকের অন্যায়কেও অন্যায় বলতে পারে, ক্ষমতাকে আমানত মনে করে এবং বাস্তবতা বুঝে ন্যায় প্রতিষ্ঠায় সক্ষম—শুধু সেই নেতৃত্বই ইসলামের মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
এই কারণেই “ভোটেই ইসলামী রাষ্ট্র”—এই ধারণাটি একটি ইল্যুশন। সত্য হলো—ইসলামী রাষ্ট্র ভোটে আসে না, আসে ন্যায় দিয়ে। ভোট সেই ন্যায়ের একটি সম্ভাব্য দরজা হতে পারে, আবার ভুল সিদ্ধান্তে সেই দরজাই বন্ধও হয়ে যেতে পারে। তাই এবারের নির্বাচন হোক বা যেকোনো নির্বাচন—আমাদের করণীয় একটাই: দল নয়, ন্যায়কে বেছে নেওয়া; স্লোগান নয়, ফলাফল দেখা; আবেগ নয়, বিবেক দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
এই অবস্থান নিলে দ্বিধা কমে যায়। তখন মানুষ বুঝতে পারে—সে ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব এড়াচ্ছে না; বরং বাস্তবতার ভেতরেই আল্লাহর চাওয়ার কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করছে।
© ঢালী আরিফ | Dhali Arif