ডেস্ক নিউজ:
দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সময়োপযোগী ও প্রযুক্তিনির্ভর কাঠামোয় রূপান্তরের লক্ষ্যে সংস্কারবাদী ও দূরদর্শী নেতৃত্ব নিয়োগের আহ্বান জোরালো হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, ঘোষিত নীতিমালা ও নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কেবল প্রশাসনিক দক্ষতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বাস্তব অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি–বোঝাপড়া এবং বৈশ্বিক শিক্ষাপ্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নেতৃত্ব। তারা মনে করছেন, শিক্ষা খাতের চলমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও কাঙ্ক্ষিত আধুনিকায়ন নিশ্চিত করতে নতুন শিক্ষামন্ত্রীর ক্ষেত্রে এসব গুণাবলিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
১৬ ফেব্রুয়ারি, সোমবার গণমাধ্যমে দেয়া এক বিবৃতিতে শিক্ষা অর্থনীতিবিদ ও এডুকেশন রাইটস পার্লামেন্ট (ইআরপি)-এর আহ্বায়ক অধ্যাপক এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষা খাতে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকীকরণের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে লক্ষ লক্ষ নতুন কর্মসংস্থান ও ফ্রিল্যান্সার তৈরির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন। এজন্য বাজারমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কারিগরি শিক্ষা, দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক গুরুত্ব পাবে।
তিনি উল্লেখ করেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও আইসিটি প্রকল্পে বাজেট বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রয়োজন নজিরবিহীন কাঠামোগত সংস্কার। ডিজিটালাইজেশন, কারিগরি রূপান্তর এবং আর্থিক প্রসারের মতো বড় পরিবর্তনগুলো সমন্বয় করতে হলে আন্তঃবিভাগীয় দক্ষতা ও আধুনিক প্রশাসনিক সক্ষমতা অপরিহার্য।
তবে এই ডিজিটাল রূপান্তরের পাশাপাশি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি বা ‘একাডেমিক ইন্টেগ্রিটি’ রক্ষার সংকটের দিকেও নজর দিতে হবে। অধ্যাপক আসাদুল্লাহ সতর্ক করে বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে প্রযুক্তির অপব্যবহারের ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠদানের গুণগত মান হুমকির মুখে পড়েছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের দ্বারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর অনৈতিক ব্যবহার এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ঘটনা আমাদের ডিগ্রির মানকে বৈশ্বিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে এমন একজনকে প্রয়োজন, যার অতীতে শিক্ষাক্ষেত্রে জালিয়াতি, নকল ও অনিয়ম নির্মূলে সফল এবং আপোষহীন ভূমিকা পালনের প্রমাণিত অভিজ্ঞতা রয়েছে।”
অধ্যাপক আসাদুল্লাহর ভাষায়, “পরবর্তী শিক্ষামন্ত্রীকে কেবল শিক্ষানুরাগী হলে চলবে না; তার থাকতে হবে দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, নীতিনির্ধারণে দক্ষতা এবং সংস্কারবাদী মানসিকতা। এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন, যিনি ‘শিখনহীন শিক্ষা’ ও ‘ফলাফলহীন ডিজিটালাইজেশন’-এর দীর্ঘ অচলায়তন ভেঙে দিতে সক্ষম। এজন্য আমরা ইআরপি-র পক্ষ থেকে পূর্বেই তিনটি অপরিহার্য শর্তের কথা বলেছি: ১) সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী (বিশেষ করে পরীক্ষার নকল ও প্রশ্ন ফাঁস রোধে) আপোষহীন উত্তরাধিকার, ২) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং ৩) আন্তর্জাতিক মানের উচ্চতর একাডেমিক বিশেষজ্ঞ জ্ঞান।”
খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষায় প্রযুক্তির প্রাধান্য এখন আর বিকল্প নয়, বরং অপরিহার্য বাস্তবতা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটা অ্যানালিটিক্স, সাইবার নিরাপত্তা ও উদ্ভাবনভিত্তিক কারিগরি শিক্ষাকে মূলধারায় আনতে হলে নীতিগত স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিকল্পনা প্রয়োজন। তাদের অভিমত, দেশি ও বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রবণতা সম্পর্কে সম্যক ধারণাসম্পন্ন এবং শিল্পখাতের সঙ্গে সমন্বয় করতে সক্ষম একজন শিক্ষামন্ত্রীই নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথ সুগম করতে পারবেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে তা শুধু বেকারত্ব কমাবে না, বরং বাংলাদেশকে একটি জ্ঞানভিত্তিক, উদ্ভাবনী ও রপ্তানিমুখী অর্থনীতিতে রূপান্তরের ভিত্তি তৈরি করবে।