১ এপ্রিল, ২০২৬। বাংলাদেশ সময় রাত ১২টা ৩৫ মিনিট। আমেরিকার ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারের লঞ্চ প্যাড ৩৯বি থেকে এক বিকট গর্জনে আকাশ কাঁপিয়ে উঠল ৩২২ ফুট উচ্চতার স্পেস লঞ্চ সিস্টেমে এসএলএস রকেট। রকেটের নিচে ৮৮ লক্ষ পাউন্ডের থ্রাস্ট তৈরি হলো— যা চারটি মানুষকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছে চাঁদের দিকে। ১৯৭২ সালের অ্যাপোলো-১৭ মিশনের পর এই প্রথম কোনো মানুষ পৃথিবীর কক্ষপথ ছেড়ে চাঁদের পথে যাত্রা করল। আর্টিমিস-২ হলো মানব ইতিহাসের প্রথম মিশন যেখানে একজন নারী, একজন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ এবং একজন অ-আমেরিকান নভোচারী একসঙ্গে চাঁদের পথে রওনা দিয়েছেন।
ইতিহাস গড়া চার নভোচারী
আর্টিমিস-২ মিশনের দলে রয়েছেন নাসার তিনজন এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির একজন নভোচারী। কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান, বয়স ৫০, একজন প্রাক্তন পরীক্ষামূলক পাইলট এবং ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনের (আইএসএস) সাবেক কমান্ডার। পাইলট ভিক্টর গ্লোভার, বয়স ৪৯, মার্কিন নৌবাহিনীর এভিয়েটর। তিনি হলেন প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ যিনি চন্দ্র অভিযানে মনোনীত হলেন, ক্রিস্টিনা কোচ প্রথম নারী, ওয়াইজম্যান সর্বকনিষ্ঠ বয়সের রেকর্ড ভেঙে সবচেয়ে বয়স্ক এবং কানাডার জেরেমি হ্যানসেন প্রথম অ-আমেরিকান যিনি পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথের বাইরে যাচ্ছেন।
মহাকাশযান ওরিয়ন
চার নভোচারী যে মহাকাশযানে ১০ দিন কাটাবেন তার নাম ওরিয়ন ক্যাপসুল, যার ডাকনাম দেওয়া হয়েছে “ইন্টিগ্রিটি”। মহাকাশযানের বাসযোগ্য আয়তন মাত্র ৩৩০ ঘনফুট, যা মোটামুটি দুটি মিনিভ্যানের সমান। এটি অ্যাপোলোর কমান্ড মডিউলের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি জায়গা, তবে চারজন মানুষের জন্য ১০ দিনের যাত্রায় এটি অত্যন্ত ছোট। ক্যাপসুলের চারটি জানালা দিয়ে মহাকাশের দৃশ্য দেখা যায়। মহাকাশযানের চারটি সোলার অ্যারে উইং সম্পূর্ণভাবে মোতায়েন হওয়ার পর এর “ডানার বিস্তার” দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৩ ফুট। এই সোলার প্যানেলগুলো সূর্যের দিকে ঘুরে ঘুরে বিদ্যুৎ সংগ্রহ করে এবং মহাকাশযানের লাইফ সাপোর্ট, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সিস্টেমে শক্তি সরবরাহ করে।

আর্টেমিস-২ চন্দ্র অভিযানের ১০ দিনের কর্মসূচি
- অভিযানের প্রথম দিন: উৎক্ষেপণের মাত্র ৮ মিনিটের মধ্যে নভোচারীরা মহাকাশে পৌঁছান। উড়ানের প্রথম পর্যায়ে অন্তর্বর্তীকালীন ক্রায়োজেনিক প্রপালশন স্টেজ বা আইসিপিএস থেকে ওরিয়ন আলাদা হওয়ার পর নভোচারীরা মহাকাশযানটিকে ম্যানুয়ালি নিয়ন্ত্রণ করে রকেটের উপরের স্তরটিকে টার্গেট করে ঘুরে বেড়ানোর অভ্যাস করেন, মাঝেমধ্যে মাত্র ৩৩ ফুট পর্যন্ত কাছে গিয়ে। উৎক্ষেপণের প্রায় সাড়ে আট ঘণ্টা পর নভোচারীরা সংক্ষিপ্ত বিশ্রামে যান। প্রথম দিনের রাতের দিকে প্রায় ১৩ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট পরে নভোচারীদের জাগানো হয় পেরিজি রেইজ বার্ন সম্পন্ন করতে, যা ওরিয়নকে পরের ধাপের জন্য সঠিক কক্ষপথে স্থাপন করে।
- অভিযানের দ্বিতীয় দিন: ২ এপ্রিল বৃহস্পতিবার রাত ৭টা ৪৯ মিনিটে মিশন কন্ট্রোল থেকে ট্রান্সলুনার ইগনিশনের সবুজ সংকেত পাওয়ার পর ওরিয়নের প্রধান ইঞ্জিন প্রায় ৬ মিনিট ধরে জ্বলে পৃথিবীর কক্ষপথ ছেড়ে চাঁদের দিকে ছুটতে শুরু করে। এই বার্নটি ওরিয়ন স্পেসক্রাফটকে প্রতি সেকেন্ডে ১ হাজার ২৭৪ ফুট বেগে বেগে ছুটতে সাহায্য করে। এই মুহূর্তটি ছিল ১৯৭২ সালের অ্যাপোলো প্রোগ্রামের পর প্রথমবার কোনো মানুষ পৃথিবীর কক্ষপথ ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
- অভিযানের তৃতীয় থেকে পঞ্চম দিন: ৩-৫ এপ্রিল চাঁদের দিকে ট্রানজিটের সময় নভোচারীরা ওরিয়নের সিস্টেম পর্যবেক্ষণ করেন, প্রয়োজনীয় ট্র্যাজেক্টরি কারেকশন বার্ন সম্পন্ন করেন এবং গভীর মহাকাশ ভ্রমণের প্রভাব সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করেন। ষষ্ঠ দিনের জন্য প্রস্তুতিস্বরূপ পঞ্চম দিনে ওরিয়নের কেবিনকে চন্দ্র পর্যবেক্ষণের জন্য সর্বোত্তম অবস্থায় সাজানো হয়, যাতে চাঁদের অদেখা পৃষ্ঠের ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করা যায়।
- অভিযানের ষষ্ঠ দিন: এই দিন নভোচারীরা চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে ৬ এপ্রিল প্রায় ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার মাইল দূর দিয়ে চাঁদকে পরিক্রমা করবেন এবং এটি তাদের কাছে আর্ম-লেংথে ধরা বাস্কেটবলের মতো দেখাবে। এই সময় তারা উচ্চ রেজোলিউশনের ছবি তুলবেন এবং চাঁদের অদৃশ্য পৃষ্ঠের সেই অংশগুলো পর্যবেক্ষণ করবেন যা আগে কোনো মানুষ সরাসরি চোখে দেখেনি। তবে সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে, চাঁদের পেছনে থাকার সময় প্রায় ৪০ মিনিটের জন্য মিশন কন্ট্রোলের সঙ্গে সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। এই সময়টি নভোচারীরা সম্পূর্ণ নিজেদের উপর নির্ভর করে কাজ করবেন।
- অভিযানের সপ্তম থেকে নবম দিন: ৭-৯ এপ্রিল চাঁদের পেছন থেকে ঘুরে আসার পর ওরিয়ন পৃথিবীর দিকে ফিরতি যাত্রা শুরু করে। এটি “ফ্রি-রিটার্ন ট্র্যাজেক্টরি” — অর্থাৎ চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পৃথিবীর দিকে ফেরত আসা।
- অভিযানের দশম দিন: ১০ এপ্রিল ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো উপকূলে প্যারাশুটে নেমে প্রশান্ত মহাসাগরে স্প্ল্যাশডাউন হওয়ার কথা রয়েছে।

কী খাবেন নভোচারীরা?
মহাকাশে যাওয়ার আগে নভোচারীরা ফুড সায়েন্টিস্টদের সঙ্গে বসে নিজেদের পছন্দ ও পুষ্টির চাহিদার ভিত্তিতে মেনু তৈরি করেছেন। আর্টিমিস-২ মিশনে কোনো রেফ্রিজারেটর বা ফ্রেশ ফুড বহনের সুবিধা না থাকায় সব খাবার হতে হবে শেলফ-স্ট্যাবল, মানে বিশেষভাবে সংরক্ষিত যাতে দীর্ঘদিন নষ্ট না হয়।
প্রতিদিন তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা থাকবে এবং একটি বেলায় চারজন একসঙ্গে ৬০ মিনিট বসে খাবার খাবেন। রান্নার ধরনটাও ভিন্ন — ফ্রিজ-ড্রাইড খাবারে পানি মিশিয়ে পুনরায় তৈরি করা হয়েছে, আর পাউডার ড্রিংক তৈরি করা হয়েছে। খাবার গরম করার জন্য রয়েছে সুটকেসের মতো একটি ওয়ার্মার, যা ভেলক্রো দিয়ে দেওয়ালে আটকানো যায়।
এছাড়া নভোচারীদের মেনুতে রয়েছে ভেজিটেবল কুইশ, ব্রেকফাস্ট সসেজ, বাদামসহ কুসকুস, আমের সালাদ, ব্লুবেরি দিয়ে গ্রানোলা, বার্বিকিউ বিফ ব্রিস্কেট, ব্রকোলি অ গ্রাটিন, ম্যাকারনি অ্যান্ড চিজ এবং স্পাইসি গ্রিন বিনস। প্রতিজন নভোচারী দিনে দুটি ফ্লেভারড পানীয় পাবেন, যার মধ্যে কফিও থাকতে পারে। কানাডিয়ান নভোচারী জেরেমি হ্যানসেনের জন্য বিশেষভাবে রয়েছে ম্যাপেল পণ্য, স্যামন বাইটস এবং কারি।
মহাকাশে একটি বিশেষ সমস্যা হলো ক্রাম্ব বা খাবারের ছোট টুকরা। মহাশূন্যে এগুলো ভেসে বেড়ায় এবং কোনো যন্ত্রপাতিতে ঢুকে গেলে বিপদ হতে পারে। এমনকি চোখেও ঢুকতে পারে। সে কারণেই সব খাবার এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে ক্রাম্ব না হয়।
কীভাবে ঘুমাবেন নভোচারীরা?
প্রতিদিনের সময়সূচিতে আট ঘণ্টা ঘুমের বরাদ্দ রয়েছে এবং সাধারণত চারজন একই সময়ে ঘুমাবেন। শূন্যগুরুত্বের পরিবেশে বিছানায় শুয়ে ঘুমানোর উপায় নেই, তাই নভোচারীরা হ্যামকের মতো স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে তা ক্যাপসুলের দেওয়ালে ঘুমান। মিশন স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কখ এ অনুভূতি বর্ণনা করে বলেন, “উপরে নিচে বলে কিছু নেই। আমি পা উপরের দিকে রেখে মাথা নিচের দিকে ঘুমাচ্ছি এবং এটি অত্যন্ত আরামদায়ক।”
প্রতিদিন মিশন কন্ট্রোল থেকে ওয়েক-আপ মিউজিক বাজিয়ে নভোচারীদের জাগানো হয়। তৃতীয় দিনে বেলা ২টা ৩৫ মিনিটে জন লিজেন্ডের “গ্রিন লাইট” গান দিয়ে তাদের ঘুম ভাঙানো হয়।

দিনে কত ঘণ্টা কাজ করবেন নভোচারীরা?
ওরিয়নের ভেতরে নভোচারীদের প্রতিটি দিন অত্যন্ত কর্মময়। ঘুম, ব্যায়াম, খাওয়া, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা এবং পারিবারিক যোগাযোগের পাশাপাশি মূল কাজের সময় থাকে প্রায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা। এই সময়ে নভোচারীরা মহাকাশযানের সিস্টেম পর্যবেক্ষণ করেন, ইঞ্জিন বার্ন পরিচালনা করেন, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন এবং মিশন কন্ট্রোলের সঙ্গে সমন্বয় করেন। ক্লান্তি শুধু মোট ঘুমের সময়ের বিষয় নয় — বিরতি, ইঞ্জিন বার্নের সময়, সিস্টেম চেকআউট, সব মিলিয়ে গভীর মহাকাশে দৈনন্দিন রুটিন থাকে প্রবল চাপের মধ্যে।
কিভাবে গোছল করেন নভোচারীরা?
নভোচারীদের জন্য রয়েছে একটি হাইজিন বে, যেখানে টয়লেট, দাঁত ব্রাশের সরঞ্জাম, সাবান, চুলের ব্রাশ এবং শেভিং কিট রয়েছে। গোসলের সুবিধা না থাকায় তরল সাবান, পানি এবং ড্রাই শ্যাম্পু দিয়ে পরিষ্কার থাকতে হয়। টয়লেটে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্য ছোট দরজা রয়েছে। আর্টিমিস-২ মিশনে প্রথমদিকে টয়লেটে ত্রুটি দেখা দিলে মিশন কন্ট্রোলের সহায়তায় ক্রিস্টিনা কোচ সেটি মেরামত করেন।
এছাড়া মহাকাশে শরীরের পেশি ও হাড় দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সমস্যা মোকাবেলায় প্রতিদিন ৩০ মিনিট ব্যায়াম করা বাধ্যতামূলক। মহাকাশযানে রয়েছে একটি ডুয়াল-পারপাস ফ্লাইহুইল মেশিন যা অ্যারোবিক ব্যায়ামের জন্য ব্যবহৃত হয়। এই ফ্লাইহুইলটি মহাকাশযানের দরজার নিচে বসানো এবং একইসাথে ক্যাপসুলে ওঠানামার সিঁড়ির কাজও করে। নভোচারীদের ব্যায়ামের সময় ওরিয়নের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বায়ুচলাচল এবং কাঠামোগত চাপের উপরও পরীক্ষা চলে।
নভোচারীরা ছবি ও ভিডিও পাঠাবে যেভাবে?
আর্টিমিস-২ মিশনে ওরিয়নের অপটিক্যাল কমিউনিকেশন সিস্টেম আমেরিকার দুটি গ্রাউন্ড স্টেশনের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে হাই-ডেফিনিশন ভিডিও এবং মিশনের তথ্য পৃথিবীতে পাঠিয়েছে, যা তাৎক্ষণিকভাবে হিউস্টনের মিশন কন্ট্রোলে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
মিশনের প্রাথমিক যোগাযোগ ব্যবস্থা হলো ডিপ স্পেস নেটওয়ার্ক, যা পৃথিবী থেকে ক্রমশ দূরে যাওয়ার সময়ও নভোচারীদের সঙ্গে কথা বলার সুবিধা দেয়। এছাড়া জরুরি বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থাও রয়েছে, যাতে প্রাথমিক ব্যবস্থা ব্যর্থ হলেও নভোচারীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও নেভিগেশন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।
চন্দ্র পর্যবেক্ষণের সময় নভোচারীরা চাঁদের অদৃশ্য পৃষ্ঠের উচ্চ রেজোলিউশনের ছবি এবং নিজস্ব পর্যবেক্ষণ পৃথিবীতে পাঠাবেন। যদিও চাঁদের অদৃশ্য পৃষ্ঠে আলো আংশিক থাকবে, তবু ছায়ার কারণে পৃষ্ঠের গভীরতা, পাহাড়, ঢাল ও গর্তের কিনারা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠবে।
আমেরিকার ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের গ্রিন ব্যাংক টেলিস্কোপ, যা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ পূর্ণ স্টিয়ারেবল রেডিও টেলিস্কোপ, নাসার ডিপ স্পেস নেটওয়ার্কের সঙ্গে মিলে ওরিয়নের সুনির্দিষ্ট অবস্থান নির্ণয়ে সহায়তা করছে।
চাঁদে নামলো না নভোচারীরা তাহলে কেন এই যাত্রা?
অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, যদি চাঁদে নামাই না হয় তাহলে আর্টিমিস-২-এর লক্ষ্য কী। আর্টিমিস-২ একটি ফ্রি-রিটার্ন ট্র্যাজেক্টরিতে চাঁদকে প্রদক্ষিণ করে প্রমাণ করবে যে এই মহাকাশযান একটি দলকে ভবিষ্যৎ মিশনের জন্য নিরাপদে পরিবহন করতে সক্ষম। এটি মূলত একটি পরীক্ষামূলক মিশন, যেখানে লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম, নেভিগেশন, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নভোচারীদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা সবকিছুই পরীক্ষা করা হচ্ছে। চাঁদের পৃষ্ঠে প্রথম মানব অবতরণের পরিকল্পনা রয়েছে আর্টিমিস-৩ মিশনে, ২০২৮ সালে।

কি কি গবেষণা চলবে এ অভিযানে?
নভোচারীরা নিজেরাই এই মিশনে বিজ্ঞানী এবং গবেষণার বিষয়বস্তু উভয়ই। গভীর মহাকাশ ভ্রমণ মানবদেহ, মন ও আচরণকে কীভাবে প্রভাবিত করে তা জানতে পাঁচটি গবেষণায় অংশ নিচ্ছেন তারা।
এভাটার গবেষণায় অর্গান-অন-এ-চিপ ডিভাইস ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে নভোচারীদের নিজেদের কোষ রয়েছে। এই চিপগুলো গভীর মহাকাশের বিকিরণ ও মাইক্রোগ্র্যাভিটি মানবস্বাস্থ্যের উপর কী প্রভাব ফেলে তা পরীক্ষা করবে।
এছাড়া আর্চার গবেষণায় নভোচারীরা কব্জিতে বিশেষ ব্যান্ড পরছেন যা রিয়েল-টাইমে তাদের ঘুমের ধরন, স্ট্রেসের মাত্রা, বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্ষমতা এবং দলগত গতিশীলতা পর্যবেক্ষণ করছে। আরও রয়েছে বিকিরণ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, যেখানে ক্যাপসুলের বিভিন্ন স্থানে ছয়টি সক্রিয় সেন্সর এবং নভোচারীদের পকেটে ডোজিমিটার বসানো আছে।
অভিযানের অজানা বিষয়
আর্টিমিস-২ মিশনে একই সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মানুষ গভীর মহাকাশে থাকার রেকর্ড তৈরি হচ্ছে — আগের রেকর্ড ছিল ১৯৬৮ সালে অ্যাপোলো-৮ মিশনে তিনজনের।
- মহাকাশযানের ভেতরে তাপমাত্রা বেশ ঠান্ডা। নভোচারী ভিক্টর গ্লোভার জানান যে তারা ভিন্ন ধরনের স্লিপিং ব্যাগ নিয়ে আসতে পারলে ভালো হতো।
- এই মিশনে একটি বিশেষ মাসকট রয়েছে — আট বছরের একটি শিশু যে ডিজাইন করেছে পৃথিবীকে বেসবল ক্যাপের মতো মাথায় পরা চাঁদের প্রতিকৃতি। এটি অ্যাপোলো-৮-এর বিখ্যাত “আর্থরাইজ” ছবির অনুপ্রেরণায় তৈরি এবং ক্যাপসুলের ভেতরে বেঁধে রাখা হয়েছে শূন্যগুরুত্বের নির্দেশক হিসেবে।
- যে কেউ ইচ্ছে করলে নিজের নাম নিবন্ধন করতে পারতেন এবং সেটি একটি এসডি কার্ডে সংরক্ষিত হয়ে ওরিয়নের সঙ্গে চাঁদের চারপাশে ভ্রমণ করছে।
- আর্টিমিস-২ থেকে পাঁচটি কিউবস্যাট মহাকাশে স্থাপন করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার কে-র্যাডকিউব যা মানব টিস্যুর অনুরূপ উপাদানের উপর মহাকাশীয় বিকিরণের প্রভাব পরিমাপ করবে এবং সৌদি আরবের স্পেস ওয়েদার কিউবস্যাট-১ যা উচ্চ পৃথিবীর কক্ষপথে মহাকাশ আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করবে।

৫৪ বছর পর আবার কেন চাঁদে?
ষাট ও সত্তরের দশকে নাসার চাঁদে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক—সোভিয়েত ইউনিয়নের আগে পৌঁছে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা। সেই লক্ষ্য পূরণ হওয়ার পর মনোযোগ চলে যায় আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন ও মঙ্গল অভিযানের দিকে। কিন্তু এখন লক্ষ্য বদলেছে, এবার তারা চাঁদে স্থায়ী বসতি গড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
চাঁদকে নাসা একটি পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহার করছে, কারণ মঙ্গলে পৌঁছাতে সাত মাস লাগে অথচ চাঁদে মাত্র তিন দিনে যাওয়া যায়। তাই মানুষের টিকে থাকার প্রযুক্তি, নতুন স্পেসস্যুট, লাইফ-সাপোর্ট সিস্টেম এবং বিকিরণ প্রতিরোধের পরীক্ষা চাঁদেই করা হচ্ছে। একইসঙ্গে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পাওয়া বরফ ভবিষ্যতে পানীয় জল, অক্সিজেন এবং রকেট জ্বালানি তৈরির উৎস হতে পারে।
অ্যাপোলো যুগে বাজেট ছিল বিশাল, পরে তা কমে যায়। নতুন প্রজন্মের রকেট ও প্রযুক্তি তৈরি করতে সময় লেগেছে। এখন আর্টেমিস প্রোগ্রামের মাধ্যমে নাসা আবার চাঁদে ফিরছে—প্রথমে কক্ষপথে ভ্রমণ, তারপর অবতরণ এবং অবশেষে স্থায়ী ঘাঁটি গড়ে মঙ্গল অভিযানের প্রস্তুতি। সহজ কথায়, আগে তারা গিয়েছিল শুধু পতাকা পুঁততে, এবার তারা যাচ্ছে থেকে যাওয়ার জন্য।
মহাকাশে মানবজাতির নতুন দিগন্ত উন্মোচন
ট্রান্সলুনার ইঞ্জেকশন বার্নের পর কমান্ডার ওয়াইজম্যান বলেন, “চারজন মানুষকে ২ লক্ষ ৫০ হাজার মাইল দূরে পাঠানো একটি হার্কিউলিয়ান কাজ। আমরা এখন বুঝতে পারছি এর মাধ্যাকর্ষণ কতটা।” এই মিশনে মানবজাতি পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ ২৫২,৭৯৯ মাইল বা ৪০৬,৮৪১ কিলোমিটার দূরে পৌঁছাবে — যা অ্যাপোলো-১৩-এর রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড গড়বে।
এই অভিযান শুধু চাঁদের পথে যাওয়ার অভিযান নয়। এটি মানবজাতির মঙ্গল গ্রহ অভিযানের পথেও একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ। আর্টিমিস-২ প্রমাণ করছে যে মানুষ আবার সত্যিকারের গভীর মহাকাশে যেতে পারে — এবার শুধু চাঁদ নয়, ভবিষ্যতে মঙ্গলও অপেক্ষা করছে।
তবে কি শুরু হলো সেই অখণ্ড পৃথিবীর পথচলা?
একটা সময় মানুষ মানচিত্রের রেখা, কাঁটাতারের সীমান্ত আর যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী অধ্যায় দিয়ে পৃথিবীকে টুকরো টুকরো করে ভাগ করেছিল। কিন্তু আজ সময় বদলেছে; আধুনিক প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ, জলবায়ু সংকটের অভিন্ন হুমকি আর বিশ্ব অর্থনীতির নিবিড় আন্তঃনির্ভরশীলতা আমাদের ভৌগোলিক গণ্ডির বাইরে এসে একাত্ম হতে বাধ্য করছে। আমাদের বর্তমানের এই বৈশ্বিক সংহতি আর অভিন্ন লড়াইগুলো কি তবে সেই অখণ্ড পৃথিবীরই পদধ্বনি—যেখানে আলাদা দেশের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে জন্ম নেবে এক সম্মিলিত ‘মানব রাষ্ট্র’?
এই রূপান্তরে মানুষের একমাত্র পরিচয় হবে সে মানুষ এবং সীমান্তগুলো কেবল ইতিহাসের ধুলোবালিমাখা পাতায় ঠাঁই নেবে। এই নতুন বিন্যাসে পৃথিবী হবে একটি অখণ্ড একক, যেখানে আমাদের সীমানা আর পৃথিবীর মানচিত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং প্রতিটি গ্রহ-উপগ্রহ হবে একেকটি নতুন ‘দেশ’ আর ছায়াপথ বা গ্যালাক্সি ক্লাস্টারগুলো হবে আগামীর একেকটি বিশাল ‘মহাদেশ’। আমরা কি তবে সেই মহাজাগতিক নাগরিকত্বের দিকেই পা বাড়াচ্ছি?
লেখক:
মো: আরিফুল ইসলাম
সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক
কুয়ালালামপুর, মালয়েশিয়া।
রেফারেন্স: ১. NASA. (2026, April 1). Artemis II mission launch from Kennedy Space Center. Washington, DC: NASA Headquarters. ২. NASA. (2026). Orion spacecraft specifications and crew operations. Houston, TX: Johnson Space Center. ৩. NASA. (2026). Artemis II daily mission log: April 1–10, 2026. Houston, TX: Mission Control. ৪. NASA Food Science Division. (2026). Shelf-stable food menu for Artemis II astronauts. Washington, DC: NASA Technical Report. ৫. Koch, C. (2026). Astronaut sleep experience in microgravity: Artemis II personal account*. NASA Oral History Project. ৬. NASA Exercise Physiology Laboratory. (2026). Flywheel exercise protocols for deep space missions. Houston, TX: NASA Technical Report. ৭. NASA Hygiene Systems Team. (2026). Personal hygiene and sanitation in Orion spacecraft. Washington, DC: NASA Technical Report. ৮. NASA Communications Division. (2026). Optical communication systems in Artemis II. Washington, DC: NASA Technical Report. ৯. NASA Science Directorate. (2026). Human health research in deep space: AVATAR and ARCHeR studies. Washington, DC: NASA Technical Report. ১০. NASA. (2026). Artemis II mission objectives and future lunar landing plans. Washington, DC: NASA Technical Report.