সম্পাদকের কলাম:
১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই নীল আর্মস্ট্রং যখন চাঁদের ধুলায় প্রথম পা রাখলেন, তখন তিনি বলেছিলেন — “এটা মানুষের জন্য একটি ছোট পদক্ষেপ, মানবজাতির জন্য এক বিশাল অগ্রগতি।” সেই মুহূর্তে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রেখে ভেবেছিল — একদিন কি সাধারণ মানুষও চাঁদে যেতে পারবে?
এখন, ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে সেই প্রশ্নটি আর কাল্পনিক নয়। নাসা-র আর্টেমিস (II) মিশন সফলভাবে চাঁদের কক্ষপথ প্রদক্ষিণ করে ফিরে এসেছে, এবং মহাকাশ অন্বেষণের একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে — যেখানে সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি কোম্পানি একসঙ্গে কাজ করছে একটি টেকসই মহাকাশ অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্যে। কিন্তু প্রশ্ন হলো — চাঁদ কি সত্যিই পর্যটনের হট স্পটে পরিণত হবে? নাকি বিগত ৫৪ বছরের মতো আরও একটি উচ্চাভিলাষী স্বপ্নই থেকে যাবে?
স্পেস ট্যুরিজমের ধারণাটি নতুন নয়। ২০০৫ সালে স্পেস অ্যাডভেঞ্চারস কোম্পানি “ডিএসই-আলফা” নামে একটি মিশন ঘোষণা করে, যেখানে দুজন পর্যটককে সয়ুজ মহাকাশযানে চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরত্বে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু আজও সেই মিশন আলোর মুখ দেখেনি।
এরপর আসে জাপানি বিলিয়নেয়ার ইউসাকু মায়েজাওয়ার উদ্যোগ — “ডিয়ারমুন” প্রজেক্ট। এই প্রজেক্টে মায়েজাওয়া ও আটজন শিল্পীকে স্পেসএক্স-এর স্টারশিপ রকেটে চাঁদের চারদিকে ভ্রমণ করানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু স্টারশিপ-এর উন্নয়নে ব্যাপক বিলম্ব এবং মায়েজাওয়ার সম্পদ অর্ধেকে নেমে আসায়, ২০২৪ সালের জুনে প্রজেক্টটি সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হয়। এই বাতিলের ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয় — চন্দ্র পর্যটন এখনও প্রতিশ্রুতির জগতে বাস করছে, বাস্তবতার জগতে নয়।

এবার ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল পৃথিবীর মহাকাশ ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় যোগ হয়েছে। নাসা তার আর্টেমিস II মিশন পরিচালনা করে, যেখানে মহাকাশচারীরা চাঁদের চারদিকে ভ্রমণ করেন এবং ৬ এপ্রিল এটি মানব মহাকাশ ভ্রমণের সবচেয়ে দূরতম রেকর্ড ভেঙে দেয়, যা আগে অ্যাপোলো-১৩ ধরে রেখেছিল। মিশনটি চাঁদের দূরপ্রান্তের এমন কিছু এলাকা প্রথমবারের মতো দিনের আলোয় সরাসরি পর্যবেক্ষণ করে এবং ৩৫টি লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১০টি বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্য পূরণ করে, যার মধ্যে ছিল ভবিষ্যৎ অবতরণ স্থান চিহ্নিত করা।
নাসা-র পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালেই আর্টেমিস III মিশন পরিচালিত হবে, যা পৃথিবীর কক্ষপথে স্পেসএক্স ও ব্লু অরিজিন-এর চন্দ্রযান পরীক্ষা করবে। ২০২৮ সালের শুরুতে আর্টেমিস IV মিশনে মহাকাশচারীরা প্রথমবারের মতো চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে অবতরণ করবেন। এরপর থেকে প্রতি বছর একটি করে চন্দ্রাভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে, এবং সাথে ২০৩২ সালের মধ্যে একটি স্থায়ী চন্দ্র ঘাঁটি গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইলন মাস্ক দীর্ঘদিন ধরে চাঁদকে “বিক্ষেপ” বলে অভিহিত করতেন এবং মঙ্গল অভিযানকে প্রাধান্য দিতেন। কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্পেসএক্স ঘোষণা করে যে তারা মঙ্গল পরিকল্পনাকে “পাঁচ থেকে সাত বছর” পিছিয়ে দিয়েছে এবং চন্দ্র অভিযানে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেছে। স্পেসএক্স-এর স্টারশিপ-এর জন্য নাসা-র প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি রয়েছে, যা হবে মহাকাশচারীদের চাঁদের পৃষ্ঠে নামানোর বাহন।
জেফ বেজোস-এর ব্লু অরিজিন-এর পদক্ষেপটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৬ সালের ৩০ জানুয়ারি ব্লু অরিজিন ঘোষণা করে যে তারা তাদের নিউ শেপার্ড সাব-অরবিটাল মহাকাশ পর্যটন প্রোগ্রাম “কমপক্ষে দুই বছরের” জন্য বন্ধ রাখবে, কারণ তারা মানব চন্দ্র অভিযানে মনোযোগ দিতে চায়। উইলিয়াম শ্যাটনার, মাইকেল স্ট্র্যাহান, কেটি পেরি সহ প্রায় ৯০ জন সেলিব্রিটিকে মহাকাশের প্রান্তে পাঠিয়ে আসা ব্লু অরিজিন এখন সেই পর্যটন ব্যবসা থামিয়ে নাসা-র চুক্তিতে বিনিয়োগ করছে। এই সিদ্ধান্ত একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় — সাব-অরবিটাল পর্যটন থেকে বেশি মুনাফা নেই, আসল বাজার হলো চাঁদ।
চাঁদ থেকে পৃথিবীকে দেখা — এটি সম্ভবত মানবজাতির সবচেয়ে শক্তিশালী অভিজ্ঞতা হতে পারে। মহাকাশ বিশেষজ্ঞরা এই অনুভূতিকে “ওভারভিউ ইফেক্ট” বলেন — যেখানে মানুষ পৃথিবীকে একটি ক্ষুদ্র, নাজুক, সীমানাহীন গ্রহ হিসেবে দেখতে পায় এবং তার দৃষ্টিভঙ্গি আমূল বদলে যায়। চাঁদে পর্যটকরা যা দেখতে পাবেন তা অভূতপূর্ব — আর্থরাইজ: চাঁদের দিগন্তে পৃথিবীর উদয় — যা অ্যাপোলো-৮ মিশনের বিখ্যাত ফটোগ্রাফে ধরা পড়েছিল ট্র্যাঙ্কুইলিটি বেস: যেখানে ১৯৬৯ সালে আর্মস্ট্রং ও অলড্রিন প্রথম পা রেখেছিলেন চাঁদের দক্ষিণ মেরু: যেখানে বরফের আধার রয়েছে এবং ভবিষ্যৎ উপনিবেশের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি
অ্যাপোলো-১১-এর অবতরণস্থল ট্র্যাঙ্কুইলিটি বেসকে ইতিমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউ মেক্সিকো রাজ্য তাদের ঐতিহ্য নিবন্ধনে অন্তর্ভুক্ত করেছে, যা এই স্থানটির সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের স্বীকৃতি। এত উৎসাহের মাঝেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন। জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি-র স্পেস পলিসি ইনস্টিটিউট-এর পরিচালক স্কট পেস বলেছেন, “চাঁদে পানি আছে — কিন্তু এটা বলা যেন বলা হচ্ছে, পশ্চিমে সোনা আছে।” অর্থাৎ সম্পদ আছে, কিন্তু তা উত্তোলন ও ব্যবহার করা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা।
২০২৬ সাল পর্যন্ত চাঁদের পথে যে পর্যটন যান পাঠানোর ঘোষণা হয়েছিল, তার কোনোটিই বাস্তবে কার্যকর হয়নি। এবং মহাকাশ পর্যটনের বাজার উচ্চ ব্যয় ও চাহিদার অভাবে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। কলোরাডো স্কুল অব মাইনস-এর সেন্টার ফর স্পেস রিসোর্সেস-এর পরিচালক অ্যাঞ্জেল অ্যাবুড-মাদ্রিদের কথায়, “মহাকাশ অর্থনীতি যদি ভবিষ্যতে কোটি কোটি ডলারের হতে হয়, তাহলে শুধু স্যাটেলাইট যোগাযোগের বাইরেও রাজস্বের উৎস খুঁজতে হবে।”

এছাড়া চন্দ্র পর্যটনের আলোচনায় চীনকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে চীন তাদের নতুন মেংঝো মহাকাশযানের সফল ইন-ফ্লাইট অ্যাবোর্ট পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহন সচিব শন ডাফি সতর্ক করেছেন, “তারা (চীন) তাদের সময়সীমা পিছিয়ে দেয়, আর আমরা একটি প্রতিযোগিতায় আছি।”
চীনের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে মানব অবতরণ এবং এর পরবর্তী দশকে একটি চন্দ্র গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন। এই ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আসলে চন্দ্র পর্যটনকে ত্বরান্বিত করবে, কারণ প্রতিটি সফল অভিযান বেসরকারি বিনিয়োগের পথ সুগম করে।
চন্দ্র পর্যটনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো ঐতিহ্য সংরক্ষণ। অ্যাপোলো-১১-এর অবতরণস্থলের পদচিহ্নগুলি এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থানগুলি সংরক্ষণ করার কোনো আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো এখনও নেই। “ফর অল মুনকাইন্ড” নামক একটি সংগঠন আন্তর্জাতিক প্রোটোকল তৈরিতে কাজ করছে, যাতে মহাকাশে মানবজাতির ঐতিহ্য স্থানগুলি রক্ষা পায়।
তাছাড়া, চন্দ্র পর্যটন শুধু ধনীদের বিনোদন হলে তা বৈশ্বিক বৈষম্যকেই আরও গভীর করবে। দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের ভাষায়, এমন কোনো কাজ নৈতিক হতে পারে না যা সর্বজনীন আইনে পরিণত হওয়ার যোগ্য নয়। কোটি কোটি মানুষ পৃথিবীতে বেঁচে থাকার সংগ্রামে যখন ক্লান্ত, তখন কয়েকজন বিলিয়নেয়ারের চাঁদে বেড়াতে যাওয়া কতটা ন্যায়সঙ্গত — এই প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক থাকবেই।
একদিন চাঁদ পর্যটনের হট স্পটে পরিণত হবে — এটি নিশ্চিত, তবে সেটি কখন হবে, তা নিয়ে মতভেদ আছে। নাসা ২০২৮ সালের শুরুতে প্রথম চন্দ্র অবতরণ মিশনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এবং এরপর প্রতি বছর একটি করে মিশন পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। নাসা ব্লু অরিজিন তাদের ব্লু মুন চন্দ্রযানের প্রথম মানববিহীন পরীক্ষা উৎক্ষেপণ ২০২৬ সালের মধ্যেই করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
তবে বাণিজ্যিক পর্যটনের জন্য আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। প্রযুক্তির অগ্রগতি, খরচ হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন — এই তিনটি শর্ত পূরণ না হলে চাঁদ পর্যটন সাধারণ মানুষের নাগালে আসবে না।
কার্ল সাগান তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “পেইল ব্লু ডট”-এ লিখেছিলেন — “কোথাও, কিছু অবিশ্বাস্য জিনিস আবিষ্কারের অপেক্ষায় আছে।” চাঁদ হয়তো সেই অবিশ্বাস্য কিছুর দ্বারপ্রান্ত। মানবজাতি কি সেই দরজা খুলতে পারবে — নাকি আবার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে? উত্তর লুকিয়ে আছে আগামী দশকের ইতিহাসে।
তথ্যসূত্র: ১) National Aeronautics and Space Administration. (2026). Artemis: Moon to Mars — Human lunar exploration roadmap. NASA Human Exploration and Operations Mission Directorate. https://www.nasa.gov/humans-in-space/artemis/ ২) NASA Office of Inspector General. (2021). NASA's management of the Artemis missions (Report No. IG-21-004). https://oig.nasa.gov/docs/IG-21-004.pdf ৩) U.S. Government Accountability Office. (2023). NASA Artemis: Actions needed to improve transparency and assess long-term affordability (Report No. GAO-23-106164). https://www.gao.gov/products/gao-23-106164 ৪) Sagan, C. (1994). Pale blue dot: A vision of the human future in space. Random House. ৫) Kant, I. (1785). Groundwork of the metaphysics of morals (A. W. Wood, Trans., 2002 ed.). Cambridge University Press. (মূল রচনা ১৭৮৫) ৬) Tsiolkovsky, K. E. (1903). The exploration of cosmic space by means of reaction devices Nauchnoye Obozreniye [Science Review], 5. (উদ্ধৃতি: "পৃথিবী মানবজাতির দোলনা...") ৭) Blue Origin. (2026, January 30). Blue Origin to pause New Shepard flights for no less than two years [Press Release]. Blue Origin, LLC. https://www.blueorigin.com/news/new-shepard-to-pause-flights ৮] dearMoon Project. (2024, June 1). Notice of project cancellation [Official Statement]. Yusaku Maezawa / dearMoon. https://dearmoon.earth/pdf/dearMoon_EN_240601.pdf ৯) Foust, J. (2024, June 2). Japanese billionaire cancels planned Starship lunar mission. SpaceNews. https://spacenews.com/japanese-billionaire-cancels-planned-starship-lunar-mission/ ১০) Desmarais, A., & Associated Press. (2026, April 14). Shooting for the moon: What's next for NASA after Artemis II's lunar fly-by? Euronews. https://www.euronews.com/next/2026/04/14/shooting-for-the-moon-whats-next-for-nasa-after-artemis-iis-lunar-fly-by ১১)] Wolfson, E. (2026, April 7). Artemis II reignites deep-space travel. Will it also boost a lunar economy? The Christian Science Monitor. https://www.csmonitor.com/USA/Society/2026/0407/artemis-ii-nasa-moon-economy ১২) Reints, R. (2026, February 9). Elon Musk postpones Mars plans in favor of building "Moon City." TIME Magazine. https://time.com/7373155/elon-musk-mars-moon-city/