মালয়েশিয়া প্রতিনিধি:
রমজান এলেই মালয়েশিয়াজুড়ে এক ভিন্ন আধ্যাত্মিক ও উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। রাজধানী কুয়ালালামপুরের মারদেকা স্কয়ার থেকে শুরু করে দেশের ঐতিহাসিক মসজিদগুলো—জাতীয় মসজিদ মসজিদ নেগারা, মসজিদ জামেকসহ অসংখ্য মসজিদে ইফতারের সময় দেখা যায় এক অনন্য দৃশ্য। বহুজাতি ও বহুভাষাভাষী মুসলিমরা সামনে সাজানো নানা রকম খাবার নিয়ে একসঙ্গে বসে রোজা ভাঙেন এবং আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
ইফতার শুরু হয় সাধারণত খেজুর দিয়ে। সঙ্গে থাকে তাজা ফলের প্ল্যাটার—তরমুজ, আনারস, পেঁপে, ড্রাগন ফলসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফল, সাথে হলুদ কমলার রং যেন এনে দেয় বেহেশতি আভা। পানীয় হিসেবে পরিবেশন করা হয় সিরাপ বান্দুং, তে-তারে, নানা ধরনের ফ্রেশ জুস এবং জনপ্রিয় ঠান্ডা পানীয় আইস লেমন টি (চা), যা সারাদিন রোজা রাখার পর শরীরে সতেজতা এনে দেয়।
প্রধান খাবারের তালিকায় থাকে নানা ধরনের ভাত ও মাংসের পদ। সুগন্ধি নাসি বিরিয়ানি, নাসি লেমাক, ম্যান্ডি রাইস এবং সাদা ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করা হয় চিকেন কারি, বিফ রেনডাং, গ্রিলড চিকেন ও মাটন কারি। এসব খাবারের সঙ্গে থাকে সাম্বল, আচার এবং বিভিন্ন ধরনের সবজি রান্না, যা ইফতারের টেবিলকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে।
ইদানিং স্থানীয় খাবারের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের খাবারও হয়ে উঠেছে মালয়েশিয়ার ইফতার আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শাওয়ারমা, কাবাব, হুমুস, ফালাফেল এবং তাজা পিটা ব্রেড ইফতার টেবিলে বেশ জনপ্রিয়। অনেক জায়গায় লাইভ গ্রিল বা বারবিকিউ কাউন্টার থাকে, যেখানে অতিথিরা গরম গরম গ্রিলড চিকেন ও সিফুড উপভোগ করতে পারেন।

ইফতারের আরেকটি আকর্ষণ বিভিন্ন ধরনের স্যুপ ও হালকা খাবার। লেন্টিল স্যুপ, চিকেন স্যুপ এবং মালয়েশিয়ার ঐতিহ্যবাহী বুবুর লাম্বুক বিশেষভাবে জনপ্রিয়। চাল, মাংস, নারকেল দুধ ও মশলা দিয়ে তৈরি এই বিশেষ খিচুড়ি রমজান মাসে বিভিন্ন মসজিদে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। এছাড়া স্প্রিং রোল, সামোসা এবং নানা ধরনের ফ্রিটার্সও ইফতারের টেবিলে থাকে।
মালয়েশিয়ার জনপ্রিয় খাবারগুলোর মধ্যে অন্যতম নাসি লেমাক, যা সাধারণত সকালের নাস্তা হিসেবে খাওয়া হলেও রমজানে ইফতার মেনুতেও দেখা যায়। নারকেল দুধে রান্না করা সুগন্ধি ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করা হয় ইকান বিলিস (শুকনো মাছ), ঝাল সাম্বল, শসা, সিদ্ধ ডিম এবং ভাজা চিনাবাদাম। পুষ্টিগুণে ভরপুর এই খাবারটি ইফতারের জন্য বেশ উপযোগী।
রমজানের ইফতার বাজারে মুর্তাবাকও খুব জনপ্রিয়। এটি ডিম ও মাংস দিয়ে তৈরি মালয়েশিয়ান স্টাইলে ভাজা পরোটা বা প্যানকেক, যা বাইরে থেকে মচমচে এবং ভেতরে নরম ও মশলাদার। একইভাবে সাতে বা গ্রিলড মাংসের কাঠি কাবাবও বেশ জনপ্রিয়, যা সাধারণত চিকেন, গরু বা ভেড়ার মাংস দিয়ে তৈরি করে বাদামের সস, শসা ও কাটা পেঁয়াজের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়।
ইফতার বাজারে বিভিন্ন ধরনের স্ট্রিট ফুডও পাওয়া যায়। সাবমেরিন স্যান্ডউইচ ধরনের বার্গার, কারি পাফের মতো মচমচে পেস্ট্রি, কিংবা জাপানি ধাঁচের কারাগে চিকেনও এখন বেশ জনপ্রিয়। অনেক জায়গায় মেন্তাই সুশিও পাওয়া যায়, যা ক্রিমি সস দিয়ে তৈরি করে টর্চ দিয়ে হালকা পোড়ানো হয়।

মিষ্টান্নের দিক থেকেও মালয়েশিয়ার ইফতার টেবিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। কেক, পুডিং, জেলি, কাস্টার্ডের পাশাপাশি থাকে ঐতিহ্যবাহী কুইহ, চেন্ডোল এবং আইস কাচাং। এছাড়া দোদল নামে একটি বিশেষ মিষ্টিও বেশ জনপ্রিয়, যা গুড়, নারকেল দুধ ও চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি হয় এবং চিউই টফির মতো স্বাদ দেয়।
হালকা নাস্তার মধ্যে পিসাং গোরিং বা কলা ভাজা খুবই জনপ্রিয়। পাকা কলা দিয়ে তৈরি এই মচমচে খাবার ইফতারের সময় বেশ উপভোগ্য। পানীয়ের মধ্যে গোলাপ জল ও বাষ্পিত দুধ দিয়ে তৈরি ঠান্ডা পানীয়, বাসিল সিড, নারকেল দুধ ও পাণ্ডান পাতার মিশ্রণে তৈরি বিভিন্ন পানীয়ও বেশ জনপ্রিয়। এছাড়া সয়া দুধ এবং মিষ্টি সবুজ মটরশুঁটির পানীয়ও পুষ্টিকর ইফতার হিসেবে পরিচিত।
মালয়েশিয়ার ইফতার শুধু ধর্মীয় উপবাস ভাঙার সময় নয়, এটি যেন এক প্রকার খাবারের স্বর্গরাজ্য। প্রতিটি খাবারের স্বাদ, উপকরণ ও ইতিহাস মালয়েশিয়ার বহুমুখী সংস্কৃতিকে প্রতিফলিত করে। স্থানীয় বাজার, হোটেল ও রেস্টুরেন্টগুলোতে বাহারি ইফতার আয়োজন করা হয়, যা প্রতিটি রোজাদারের জন্য এক আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। মালয়েশিয়ায় ইফতার করা মানে শুধু পেট ভরানো নয়, বরং এটি একটি চমৎকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবের অংশও বটে।